Published On: মঙ্গল, নভে. 12th, 2019

রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ, সময়সারণী

Share This
Tags

কলকাতা: প্রায় চার পুরুষ ধরে শোনা গিয়েছে রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ মামলার কথা। বহু বিতর্কিত, বহুল আলোচিত প্রায় ১৩৩ বছর আগে শুরু, সম্প্রতি সেই মামলার রায় ঘোষিত হল। ১৫২৮ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ হয়েছিল। পরে বেশ কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দাবি করে, মন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল।  এই দাবিকেই মান্যতা দেয় আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-র রিপোর্ট । ২০০২ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট এএসআইকে অযোধ্যার ওই জমিতে খনন কাজ চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশ মেনে সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে বহু প্রাচীন নিদর্শন হাতে আসে এএসআইয়ের। হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, পুরাতন স্তম্ভ, বেশ কিছু স্থাপত্য উদ্ধার করেন ঐতিহাসিকরা। তাতেই আরও স্পষ্ট হয় বাবরি মসজিদ পরে সেখানে তৈরি করা হয়েছিল। এদিকে,  মন্দির-মসজিদ বিতর্ককে কেন্দ্র করে ১৮৫৩ সালে এখানে প্রথম সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল বলে সরকারি নথি থেকে জানা গিয়েছে। হিন্দু-মুসলিম এই সংঘর্ষ বন্ধ করতে ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৯ সালে পুরো এলাকাটি দুই ভাগে ভাগ করে ঘিরে দেয়। এর একভাবে হিন্দুরা অন্যভাগে মুসলিম সম্প্রদায় আলাদাভাবে প্রার্থনা করতে পারতেন। এভাবেই কেটে যায় আরও ৯০ বছর। সব কিছু ঠিকমতোই চলছিল। কিন্তু ১৯৪৯ সালে হঠাৎ করেই ওই মসজিদের ভিতরে একটি রামের মূর্তি স্থাপন করা হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে মামলা শুরু হয়। এই দীর্ঘ সময় দেশের রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে এই মামলা। রাম মন্দির মামলাকে কেন্দ্র করে অনেক উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছে দেশ। শীর্ষ আদালতের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চে একটানা ৪০ দিন শুনানির পর এদিন সেই মামলার অবসান হল বলা যায়। ১৯৪৯-সে বছর শীতকালে ২২-২৩ ডিসেম্বর নাগাদ বিতর্কিত সৌধের মধ্যে রাম লালা-র মূর্তি দেখা যায়। হিন্দুরা দাবি করে এ হল দৈব আবির্ভাব। কিন্তু অনেকে বলেন, মূর্তিটি কেউ সেখানে রেখে এসেছে। ১৯৫০-রামলালার মূর্তি পূজার অধিকারের আবেদন জানিয়ে ফৈজাবাদ জেলা আদালতে আবেদন করলেন গোপাল শিমলা বিশারদ। ১৯৫০- মূর্তি রাখার এবং পূজা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মামলা করলেন পরমহংস রামচন্দ্র দাস। ১৯৫৯- ওই স্থানের অধিকার চেয়ে মামলা করে নির্মোহী আখড়া। ১৯৬১- একই দাবি জানিয়ে মামলা করল সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড। ১৯৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে স্থানীয় আদালত সরকারকে নির্দেশ দেয়, হিন্দু তীর্থযাত্রীদের প্রবেশাধিকার দিতে। ১৯৮৯ সালের ১৪ অগাস্ট- এলাহাবাদ হাইকোর্ট , বিতর্কিত স্থানে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। ১৯৯০ সালের ২৫ ডিসেম্বর- বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানির গুজরাতের সোমনাথ থেকে রথযাত্রা শুরু। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২- করসেবকরা বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়। অযোধ্যার জমি অধিগ্রহণ করার জন্য ১৯৯৩ সালের ৩ এপ্রিল উত্তরপ্রদেশে জমি অধিগ্রহণ আইন পাস হয়। আইন পাস হলেও ইলাহাবাদ হাইকোর্টে আইনের বিভিন্ন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মামলা দায়ের হয়। ওই মামলা এখনও হাইকোর্টে বিচারাধীন। ২৪ এপ্রিল, ১৯৯৪- সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক ইসমাইল ফারুকি মামলায় রায়ে জানায়, মসজিদ ইসলামের অন্তর্গত ছিল না। ২০০২-এর এপ্রিলে বিতর্কিত জায়গার মালিকানা নিয়ে হাইকোর্টে শুনানি শুরু। এই মামলায় ২০০৩ সালের ১৩ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট তার নির্দেশে জানায়, অধিগৃহীত জমিতে কোনও রকমের ধর্মীয় কার্যকলাপ চলবে না। ১৪ মার্চ- সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ইলাহাবাদ হাইকোর্টে চলা দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার অন্তর্বর্তী আদেশ বজায় থাকবে। ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১০- ইলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেয়, বিতর্কিত জমি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হোক। ২-১ ভিত্তিতে রায়দান হয় অর্থাৎ ওই রায়ে তিন বিচারপতি সহমত হননি। ২০১১-র ৯ মে অযোধ্যা জমি বিতর্কে হাই কোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৬-র ২৬ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত স্থানে রাম মন্দির তৈরির অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। ২০১৭-র ২১ মার্চ শীর্ষ আদালতের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জেএস খেহর যুযুধান পক্ষগুলিকে আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেন। ইলাহাবাদ হাই কোর্ট ১৯৯৪ সালে যে রায় দিয়েছিল তাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলার শুনানির জন্য ৭ অগস্ট- তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট। ৮ অগস্ট উত্তর প্রদেশের শিয়া সেন্ট্রাল বোর্ড সুপ্রিম কোর্টে জানায়, বিতর্কিত স্থান থেকে কিছুটা দূরে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মসজিদ বানানো যেতে পারে। ১১ সেপ্টেম্বর- সুপ্রিম কোর্ট ইলাহাবাদ হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দেয়, বিতর্কিত জমির ব্যাপারে সদর্থক মধ্যস্থতার জন্য ১০ দিনের মধ্যে দু’জন অতিরিক্ত জেলা বিচারককে নিয়োগ করতে হবে। উত্তর প্রদেশের সিয়া সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড ২০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টকে জানায়, অযোধ্যায় মন্দির ও লখনউয়ে মসজিদ বানানো যেতে পারে। ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮-য় সুপ্রিম কোর্টে সমস্ত দেওয়ানি মামলার আবেদনের শুনানি শুরু হয়। ১৯৯৪ সালের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ ছিল বৃহত্তর বেঞ্চে তা পুনর্বিবেচনার জন্য ৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানান আইনজীবী রাজীব ধাওয়ান। ২০ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট রায়দান স্থগিত রাখে। ২৭ সেপ্টেম্বর- পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে মামলা পাঠাতে অস্বীকার করে সুপ্রিম কোর্ট। জানানো হয়, ২৯ অক্টোবর থেকে মামলার শুনানি হবে নবগঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চে। ২৪ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত নেয়, এ সম্পর্কিত সমস্ত আবেদনের শুনানি হবে ৪ জানুয়ারি থেকে। ২০১৯-এর ৪ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট জানায়, তাদের তৈরি করা যথোপযুক্ত বেঞ্চ ১০ জানুয়ারি মামলার শুনানির তারিখ ঠিক করবে। ৮ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ ঘোষণা করে। শীর্ষে রাখা হয় প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈকে। বেঞ্চের বাকি চার সদস্য হলেন  বিচারপতি এসএ বোবদে, বিচারপতি এনভি রামান্না, বিচারপতি ইউইউ ললিত এবং বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়। ১০ জানুয়ারি বিচারপতি ইউইউ ললিত নিজেকে এই মামলা থেকে সরিয়ে নেন। বিচারপতি ললিত সুপ্রিম কোর্টকে ২৯ জানুয়ারি নতুন বেঞ্চের সামনে মামলার শুনানি শুরু করতে পরামর্শ দেন। ২৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের নতুন সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করে। এই নতুন বেঞ্চে রাখা হয় বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এসএ বোবদে, বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি অশোক ভূষণ এবং বিচারপতি এসএ নাজিরকে। ২৯ জানুয়ারি কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে বিতর্কিত অংশ বাদ দিয়ে বাকি ৬.৭ একর জমি তাদের মূল মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন জানায়। ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট জানায়, মামলার শুনানি শুরু হবে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট মধ্যস্থতার কথা বলে। আদালত নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের এই কাজে লাগানো হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য ৫ মার্চ দিন ধার্য করা হয়। ৬ মার্চ জমি বিতর্ক মধ্যস্থতার মাধ্যমে মীমাংসা করা হবে কিনা সে সম্পর্কিত রায় দান স্থগিত রাখে সুপ্রিম কোর্ট। ৯ এপ্রিল নির্মোহী আখড়া কেন্দ্রের জমি ফেরানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ৯ মে তিন সদস্যের মধ্যস্থতাকারী কমিটি সুপ্রিম কোর্টে তাদের অন্তর্বর্তী রিপোর্ট পেশ করে। ১৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট ফের মধ্যস্থতা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ১ অগস্ট এই আলোচনার রিপোর্ট জমা দেওয়ার দিন ধার্য করে শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম নির্দেশ মেনে ১ অগস্ট মধ্যস্থতা সংক্রান্ত রিপোর্ট বন্ধ খামে সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়ে। ৬ অগস্ট সর্বোচ্চ আদালত জমি মামলায় দৈনিক ভিত্তিতে শুনানির কথা জানায়। ১৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শেষ হয়। তবে স্থগিত রাখা হয় রায় ঘোষণা। ৯ নভেম্বর-২০১৯ অযোধ্যা মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করল সুপ্রিম কোর্ট।

About the Author